দ্বিতীয় অধ্যায়: মিলনমন্ত্রের অবতরণ
আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বিছানা থেকে নেমে এলাম, অস্থিরতায় তাড়াহুড়ো করে প্যান্ট পরে নিলাম, এমনকি দরকারি জিনিসপত্রও নিতে ভুলে গেলাম, সোজা দৌড়ে বেরিয়ে পড়লাম। অনেক দূর দৌড়ানোর পর হাঁপাতে হাঁপাতে বসে পড়লাম। ভাগ্যিস, এই ঘটনা প্রকাশ্যে বলা যায় না বলে, শাওয়েন নিশ্চয়ই কিছু বলবে না; অন্তত এ নিয়ে সে আমার বড় ভাইয়ের কাছে নালিশ করবে না, এটা নিয়ে আমি দুশ্চিন্তা করলাম না। তবু আমার আসলে কী হয়েছে? ঠিক তখনই উ তিয়েন আমাকে ফোন করল, জিজ্ঞেস করল কেমন আছি। সে বলল, কারখানার যন্ত্রপাতি খুবই কম দামে বিক্রি করেছে, ভীষণ কষ্ট হলেও কিছুটা টাকা তুলতে পেরেছে। জানতে চাইল, আমার কি টাকা দরকার, চাইলে কিছু দিতে পারবে।
এই সময় আমি এতটাই অস্থির ছিলাম যে, ওকে ভালোভাবে কথাও বললাম না, শুধু একটু এড়িয়ে গিয়ে ফোনটা কেটে দিতে চাইলাম। উ তিয়েন বিরক্ত হয়ে বলল, ‘‘আমি মন থেকে তোমার খবর নিতে এলাম, টাকা দিচ্ছি, তোমার কোনো ধন্যবাদ নেই, আবার মেজাজও দেখাচ্ছ?’’
আমি তাড়াতাড়ি বললাম, ‘‘তোমার ওপর রাগ দেখানোর কোনো ইচ্ছা ছিল না, সবে একটা ঝামেলায় পড়েছি, তাই মন খারাপ।’’
উ তিয়েন কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘‘কী হয়েছে, ভাই হিসেবে আমি কিছু করতে পারি?’’
অগত্যা আমি সব খুলে বললাম। উ তিয়েন স্পষ্টতই অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘‘তুমি বলছ বমির মধ্যে পোকা ছিল?’’
‘‘নিশ্চয় বলতে পারব না, হয়তো ভুল দেখেছি,’’ বললাম আমি।
‘‘তোমার জামা উঠিয়ে দেখো তো, নাভি থেকে নিচের দিকে কোনো কালো রেখা আছে কিনা,’’ বলল উ তিয়েন।
আমি একটু অবাক হলেও জামা তুলে তাকালাম, সত্যিই দেখলাম, নাভি থেকে একদম নিচে পর্যন্ত চুলের মত সরু একটা কালো রেখা নেমে গেছে, ঠিক যেমন গর্ভবতী নারীদের পেটে দেখা যায়।
‘‘বাহ, সত্যিই আছে! ব্যাপারটা কী? তুমি জানলে কী করে?’’ আমি বিস্ময় চেপে বললাম।
উ তিয়েন গভীর শ্বাস নিয়ে বলল, ‘‘তুমি থাইল্যান্ডে কোনো নারীর সংস্পর্শে এসেছিলে? বমিতে পোকা, তলপেটে কালো দাগ—এসবই হচ্ছে হেহুয়ান অভিশাপের লক্ষণ!’’
আমি কাঁপতে কাঁপতে জিজ্ঞেস করলাম, ‘‘তুমি জানলে কী করে আমি থাইল্যান্ডে কোনো নারীর সঙ্গে ছিলাম? হেহুয়ান অভিশাপ কী?’’
উ তিয়েন বলল, ‘‘নারীর সংস্পর্শে না গেলে এই অভিশাপ লাগার প্রশ্নই ওঠে না। হেহুয়ান অভিশাপ হলো থাইল্যান্ডের নারীরা তাদের স্বামীর প্রতিশোধ নিতে দেয়। এই অভিশাপ লাগলে কেবল সেই নারীই স্পর্শ করা যায়, অন্য কোনো নারীর সঙ্গে সম্পর্ক করলে ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া হয়—হালকা হলে বমি, গুরুতর হলে পুরুষত্বহানি বা মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। ভাগ্যিস, তুমি শাওয়েনের সঙ্গে কিছু করো নি, নইলে মরেই যেতে।’’
আমি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বললাম, ‘‘উ, তুমি মজা করছ না তো?’’
উ তিয়েন ঠান্ডা গলায় বলল, ‘‘এই ধরনের কথা নিয়ে আমি মজা করব কেন? আগে আমার এক ক্রেতা ছিল, ওপরে ফ্ল্যাটে থাকত, বিয়ে করেও এদিক-ওদিক ঘুরত। প্রেমিকাদের সঙ্গে দেখা করতে গেলে আমার দোকানে এসে বিশেষ তেল নিত। পরে তার পরকীয়া ধরা পড়ে, স্ত্রী কোনো কিছু না বলে এক গুরুর কাছে গিয়ে অভিশাপ দেয়। পরে ওই লোক এক নারীর সঙ্গে ছিল, আর সেখানেই মারা যায়। আমি তার মৃতদেহ দেখেছি। এক থাই বন্ধুর কাছে শুনেছিলাম, এটাই নাকি হেহুয়ান অভিশাপ।’’
এতটা শুনে আমার নিঃশ্বাসও স্বাভাবিক থাকল না। উ তিয়েন বলল, ‘‘এখন ভাবলে, বিমানে তোমার যা হয়েছিল, সেটাও এই অভিশাপের প্রাথমিক লক্ষণ ছিল। আমিও তোমাকে সাবধান করিনি—এটা আমার ভুল। থাইল্যান্ড এমন এক দেশ, যেখানে নানা রকম কালোজাদু চলে, অনেক কিছু মানতে হয়। তাড়াতাড়ি পাতায়া চলে এসো, আমি কাউকে খুঁজে তোমার অভিশাপ কাটানোর ব্যবস্থা করব। একটা কথা মনে রেখো, এখন কোনো নারীর সংস্পর্শে যেও না, এমনকি চিন্তাও কোরো না!’’
ফোন রাখার পর আমি পুরোপুরি হতবুদ্ধি হয়ে গেলাম। জীবনে তো কখনও প্রেমের সুযোগ পাইনি, আর এখানে একবারে থাইল্যান্ডে গিয়ে প্রথম নারীসঙ্গেই এমন অভিশাপ লাগল! এই সম্ভাবনা তো লটারির বড় পুরস্কার জেতার চেয়েও কম। সদ্য দেউলিয়া হয়ে এমন বিপদ জুটল! মানুষের ভাগ্য খারাপ হলে সত্যিই জল খেয়েও গলায় আটকে যায়।
আর দেরি করলাম না, সঙ্গে সঙ্গে ভাইয়াকে ফোন করে ছুটি নিলাম, তারপর সোজা হোয়াইট ক্লাউড বিমানবন্দরে গিয়ে টিকিট কেটে থাই বিমানে চড়ে বসলাম।
কয়েক ঘণ্টার দীর্ঘ ফ্লাইট শেষে পাতায়া পৌঁছলাম। উ তিয়েন বিমানবন্দরে আমার জন্য অপেক্ষা করছিল, আমাকে নিয়ে গাড়ি চালিয়ে সোজা সমুদ্রের দিকে গেল।
‘‘আমরা কোথায় যাচ্ছি?’’ জিজ্ঞেস করলাম।
‘‘শ্রদ্ধার মন্দিরে—ওখানে লুং দা কুন আছেন, তিনি জাদুবিদ্যায় পারদর্শী, অভিশাপ কাটাতে পারেন বলে শোনা যায়। চেষ্টা করে দেখি,’’ বলল উ তিয়েন।
মন্দিরে পৌঁছলাম সন্ধ্যেবেলা, পর্যটকেরা সবাই চলে গেছে। মন্দিরটি ছিল বিশাল, নানা আকারের চারমুখো দেবতার মূর্তি দাঁড়িয়ে, হাতির ভাস্কর্য সারি দিয়ে সাজানো, পুরো আঙিনায় গাছে গাছে হলুদ ফুল ফুটে আছে, পরিবেশটা ছিল নীরব ও গম্ভীর। সন্ন্যাসীর জানিয়ে দেওয়ার পর আমরা মন্দিরের অভ্যন্তরে ঢুকলাম।
অভ্যন্তরে এক বিশাল চারমুখো দেবতার মূর্তি ছিল, চারিদিকে মোমবাতি ও প্রদীপ জ্বালানো, অদ্ভুত আলোছায়ায় পরিবেশটা আরও গম্ভীর। সেখানে এক বৃদ্ধ সন্ন্যাসী, ক্ষীণদেহী, মুখজোড়া কুঞ্চিত, চুপচাপ বসে মন্ত্র পড়ছিলেন। অনুমান করলাম তিনিই লুং দা কুন।
আমরা ঢুকে প্রথমে চারমুখো দেবতাকে নমস্কার করলাম, তারপর উ তিয়েন থাই ভাষায় আমাদের অসুবিধার কথা জানাল। লুং দা কুন চোখ খুলে আমাকে দেখে ইঙ্গিত করলেন, তাঁর সামনে বসতে।
আমি বসতেই তিনি শুকনো হাত আমার মাথায় রাখলেন, তারপর এক প্রদীপ নিয়ে আমার চোখের সামনে ঘুরালেন, তারপর উ তিয়েনকে কিছু বললেন।
উ তিয়েন দৌড়ে বাইরে গেল, কিছুক্ষণের মধ্যে ফিরে এলো, হাতে একগুচ্ছ হলুদ ফুল, সম্ভবত গাছ থেকে তুলেছে।
লুং দা কুন ফুলের পাপড়ি ছিঁড়ে মুখে নিয়ে চিবোতে লাগলেন, রস বের করে এক পাত্রে থুতু ফেললেন। তারপর আঙুলে সেই রস নিয়ে আমার কপালে মাখালেন। সত্যি বলতে, ব্যাপারটা বেশ অস্বস্তিকর লাগছিল।
রস মাখানোর পর লুং দা কুন হাতজোড় করে মন্ত্র পড়তে লাগলেন, তাঁর কণ্ঠে ওঠানামা। আমার কপালে হালকা ঠান্ডা লাগছিল, যেন বাতাস লাগছে, কিন্তু অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই ঠান্ডা একেবারে হাড়কাঁপানো শীতলতায় রূপ নিল, আমার গা শিউরে উঠল। শরীরের ভেতর একটা ঠান্ডা বাতাস যেন ঘুরছিল, পেটের মধ্যে অস্বস্তি হচ্ছিল, বমি আসছিল। লুং দা কুন পাত্র এগিয়ে দিয়ে ইঙ্গিত করলেন, সেখানে বমি করতে।
আমি কয়েকবার ঢেঁকুর তুলে অবশেষে বমি করলাম—একটা তীব্র দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল, আমি নাক-মুখ চেপে ধরলাম। ভাল করে দেখলাম, বের হয়েছে কালো আঠালো তরল, তার চেয়ে বেশি ঘৃণ্য আর কিছু হতে পারে না।
লুং দা কুন বাঁশের কাঠি দিয়ে একটু নাড়লেন, তারপর উঠে উ তিয়েনকে কিছু বললেন। উ তিয়েন শুনে আমার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকাল, মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল।
‘‘উ, বুড়ো সন্ন্যাসী কী বললেন?’’ আমি দুশ্চিন্তায় জিজ্ঞেস করলাম।
উ তিয়েন কিছু বলল না, কিছু থাই মুদ্রা বের করে দেবতার পাত্রে দিয়ে এল, তারপর আমাকে নিয়ে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বেরিয়ে এলাম।
গাড়িতে উঠার পর উ তিয়েন বলল, ‘‘তুমি সত্যিই হেহুয়ান অভিশাপে পড়েছ, কিন্তু এই অভিশাপ তিনি কাটাতে পারলেন না।’’
আমি চিৎকার করে উঠলাম, ‘‘কী! তুমি তো বলেছিলে উনি খুব শক্তিশালী!’’
উ তিয়েন বলল, ‘‘তুমি যে অভিশাপ পেয়েছ, সেটা সাধারণ হেহুয়ান অভিশাপ না। সাধারণ অভিশাপ ওষুধ দিয়ে দেয়, এতে তেমন ক্ষতি হয় না—শুধু অন্য নারীর সঙ্গে থাকলে বমি হয়, বিরক্তি আসে, যাতে স্বামী ফিরে আসে স্ত্রীর কাছে। এটা কাটানো সহজ। কিন্তু তুমি যাকে স্পর্শ করেছিলে, সে নারীর সংবেদনশীল অংশে মৃতদেহের তেল ছিল। এতে ব্যাপারটা সম্পূর্ণ বদলে যায়, কারণ এতে অশুভ শক্তির সহায়তা নেওয়া হয়। এই অবস্থায় শুধু নারীসঙ্গ এড়ালেই হবে না, যেকোনো সময় মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। তুমি যা পেয়েছ, সেটা শক্তিশালী হেহুয়ান অভিশাপ।’’
আমি মুখ হাঁ করে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেলাম।