একত্রিশতম অধ্যায়: বেলুমেবার
পোশাক কেনার ব্যাপারে, রোলান স্বীকার করতেই হয়, তিনি কিছুটা একগুঁয়ে এবং স্বেচ্ছাচারী। ছোটো ডোনা বারবার অস্বীকার করার পরেও, তিনি সদ্য দেখা সেই এক ডজন দামী পোষাক সবই কিনে ফেললেন, সঙ্গে আরও কয়েকটি প্রশিক্ষণের পোশাক যা ডোনার জন্য উপযুক্ত। ফলে, তাকে এক বিশাল অঙ্কের বেলি খরচ করতে হলো, যা দেখে নামি মনে মনে কষ্ট পেল। সে তো সারাজীবন কষ্ট করে টাকা জমিয়েছে, কোকোসিয়া গ্রাম কেনার জন্য কষ্ট করে কষ্টে দিন কাটিয়েছে, এমন বিশাল খরচ করার কথা সে কখনও ভাবেনি, যদিও বিলাসবহুল সেই জিনিসপত্র খুবই পছন্দ করত।
দোকানের কর্মী হাস্যোজ্জ্বল মুখে বিদায় জানাল, আর রোলান হাতে বড় বড় ব্যাগ নিয়ে নামি এবং অভিমানী ডোনাকে নিয়ে পোশাকের দোকান ছেড়ে বেরিয়ে এলেন। রোলানের কাছে, ছোটো ডোনা এখন তার ছোট বোনের মতোই, তাই সে চেয়েছিল, তার জন্য সবথেকে ভালোটা দিতে, এতে দোষের কিছু নেই। ডোনা এই পোশাকগুলি নিতে চায়নি, কারণ সে অনেক বুঝদার, কিন্তু এই জন্যই রোলান তার প্রতি আরও যত্নবান; সে চায়নি মেয়েটির বুঝদারিত্বের জন্য সে ভালো কিছু থেকে বঞ্চিত হোক। হয়ত তার একমাত্র ভুল ছিল, ডোনাকে পোশাকগুলির মূল্য জানিয়ে দেওয়া।
জানি না, এটা কি কেবল মনের ভ্রম, নাকি আসলেই এমন, কিন্তু পোশাকের দোকান থেকে বেরোনোর পর রোলান দেখল, পুরো রাস্তাটি যেন আবার প্রাণ ফিরে পেয়েছে। দুই পাশে ফেরিওয়ালারা হাঁকডাক করছে, পথচারীরাও আগের মতো ফিসফিস করে কথা বলছে না। মনে পড়ল, শুরুতে নামি যখন জানতে চেয়েছিল কেন এমন, তখন রোলান বলেছিল, এটা হলো মনকারের স্বৈরশাসনের ফল। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, ব্যাপারটা হয়ত অন্য কিছু।
তবে এই পরিবর্তন নিয়ে রোলান খুব একটা মাথা ঘামাল না, কারণ তার পরিকল্পনা ছিল, এবার শেলজ় শহর ছেড়ে জাহাজে উঠে পড়বে। মনকারকে নিয়ে পরে মাথা ঘামাবে, যখন সত্যি সত্যি নৌবাহিনীতে যোগ দেবে, তখন তাকে শিক্ষা দেবে। নইলে হুট করে কোনো নৌবাহিনীর কর্নেলকে শায়েস্তা করলে, খুব সহজেই তার ওপর জলদস্যুর তকমা লাগতে পারে।
লুফি যখন সরাসরি ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, সেটা ছিল তার স্বপ্নের জন্য—জলদস্যু রাজা হওয়া। তাই ওসব ঝামেলা নিয়ে কখনও ভাবেনি। কিন্তু রোলান যখন ফিরে তাকালো, তখনও ছোটো ডোনা অভিমানী মুখে ছিল, আর তার বুক ভারী হয়ে উঠল। কখনও কখনও, শিশুরা অতিরিক্ত বুঝদার হলে সেটাও ভালো নয়।
রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে রোলান চারপাশে তাকাতে লাগল, ভাবল, যদি কিছু কিনে ডোনাকে খুশি করা যায়। খুঁজতে খুঁজতে সে সত্যিই একটা দোকান খুঁজে পেল, যেটা ডোনার অভিমান ভাঙাতে পারবে। সেটা ছিল এক অস্ত্রের কারিগরের দোকান।
স্মরণে এল, আগে ডোনা দ্বীপে থাকতে তাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, সে কি তরবারি শিখতে পারবে কিনা। তবে এতদিন ডোনার শরীর সুস্থ করার কাজে ব্যস্ত থাকায়, বিষয়টি পিছিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এখন ডোনার শরীর মোটামুটি সুস্থ, মৌলিক কিছু অনুশীলন শুরু করার সময় এসেছে।
এদিকে, কোরবি-ও এখন তার জাহাজে, তাই ডোনাকে যদি শেখানোই হয়, তাহলে কোরবিকেও সঙ্গে নিয়েই শেখানো যাক। কোরবিকে নিয়ে আসায় সে গার্পের সুযোগ হারিয়েছে, তাই সামরিক দিক দিয়ে নিজেই কিছুটা পূরণ করতে হবে।
এই ভাবনা নিয়ে রোলান ডোনাকে কোলে তুলে লৌহকারিগরের দোকানে ঢুকল। বলল, ‘‘চাচা, আপনি কি ওর বয়সের উপযুক্ত কয়েকটি লৌহ তরবারি বানিয়ে দিতে পারবেন? একটা ধার দেওয়া লাগবে, বাকিগুলো ধারহীন হবে, ওজন যেন ভিন্ন ভিন্ন হয়—হালকা থেকে ভারী, সব রকমের কয়েকটা দিন।’’
রোলানের কথা শুনে এবং তার কোলে থাকা ছোটো ডোনার দিকে তাকিয়ে, বৃদ্ধ লৌহকারিগর বিস্ময় মিশ্রিত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল। এত সুন্দরী মেয়েটাকে আপনি তরবারি শেখাবেন? এই বিশৃঙ্খল সমুদ্রে আত্মরক্ষার জন্য শেখাতে চান, ঠিক আছে, কিন্তু এত ছোট বয়সে শেখানো কি ঠিক?
রোলান একটু অপ্রসন্ন হয়ে ব্যাখ্যা করল, ‘‘চাচা, এমন দৃষ্টিতে তাকাবেন না। ও নিজেই শিখতে চেয়েছে, আমি জোর করে শেখাতে চাইনি।’’
বৃদ্ধ লৌহকারিগর ডোনার দিকে তাকাল, মেয়েটিও মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল, তখন আর সে রোলানের দিকে তেমন চোখে তাকাল না। ধীরে বলল, ‘‘আমি এমন অর্ডার আগে নিইনি। দাম রাখছি সাধারণ কাস্টম তরবারির মতো—একটি দশ হাজার বেলি, ধারহীন হলে আট হাজার বেলি।’’
এই দাম শুনে রোলানের কোনো বিকার হলো না, কিন্তু ডোনার মুখ কালো হয়ে গেল। একটি তরবারির দাম এত বেশি! তার বাবা বেঁচে থাকাকালেও সব মিলিয়ে কয়েক হাজার বেলির বেশি দেখেনি, আজ শুধু নিজের জন্য কেনা এই কয়েকটি তরবারিতেই লাখ লাখ বেলি চলে যাবে।
ডোনা মাথা তুলে রোলানের দিকে তাকাল, চাইল তাকে বোঝাতে, এত টাকা খরচ না করলেও চলবে, অন্য কিছু দিয়ে কাজ চালিয়ে নেওয়া যায়। কিন্তু রোলানের কোমল দৃষ্টিতে সে আর কথা বলার সাহস পেল না।
‘‘টাকার চিন্তা কোরো না, আমি তো তোমায় দেখিয়েছি, কয়েক লাখ বেলি আমার কাছে তেমন কিছু নয়, তুমি খুশি থাকলেই হলো।’’
ডোনার মাথায় হাত বুলিয়ে রোলান পকেট থেকে টাকার একটি বাক্স বের করল। বলল, ‘‘তাহলে ঠিক আছে, ধার দেওয়া একটি তরবারি দশ হাজার, ধারহীন পাঁচটি, সব মিলিয়ে চল্লিশ হাজার, মোট পঞ্চাশ হাজার বেলি।’’
এক-এক হাজার করে পঞ্চাশটি নোট গুনে রোলান এগিয়ে দিল, বলল, ‘‘ধারহীন পাঁচটি, সবচেয়ে ভারীটি সেই ধার দেওয়া তরবারির সমান...’’
‘‘ওহে, নুস দোকানদার, দেখছি এবার ভালোই কামাই হয়েছে!’’
হঠাৎ একটি হাত এসে দোকানির হাত থেকে পঞ্চাশ হাজার বেলি তুলে নিল। আশ্চর্যের বিষয়, এতটা প্রকাশ্যেই টাকা কেড়ে নেওয়া সত্ত্বেও, দোকানদার একদম রাগ দেখাল না, বরং চাটুকার মুখে সেই টাকা নেওয়া লোকটির দিকে তাকাল, বলল, ‘‘বেলুমেবার মহাশয়, এখানে মোট পঞ্চাশ হাজার বেলি আছে, আপনি নিয়ে নিন, খরচের জন্য।’’
ওই লোকটির দিকে তাকিয়ে রোলান মুহূর্তেই বুঝে গেল, কেন দোকানি প্রতিবাদ করল না, এবং কেন পুরো রাস্তা কিছুক্ষণ আগে এত গুমোট ছিল। বুঝতে পারল, নিজের অজান্তেই সে আবার মনকারের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে যাচ্ছে।
সামনে দাঁড়িয়ে থাকা উদ্ধত স্বর্ণকেশী যুবক আর কেউ নয়, শেলজ় শহরের স্বৈরশাসক মনকারের একমাত্র ছেলে, বেলুমেবার।
অজানা বা চোখে না পড়া অন্যায় রোলান হয়ত এড়িয়ে যেতে পারত। কিন্তু নিজের চোখের সামনে ঘটে যাওয়া অন্যায় সে সহ্য করতে পারল না। নৌবাহিনীর ওপর আক্রমণ? হলে হোক, বড়জোর ওয়ান্টেড হয়ে জলদস্যু হয়ে যাবে। এমনিতেই তার দায়িত্ব আছে আকাশচারি জলদস্যু দল পুনরুজ্জীবিত করার, এ সুযোগেই তাদের আত্মপ্রকাশ ঘটানো যাক।
‘‘শোনো, এটা ঠিক হচ্ছে না।’’
রোলান বা নামি কিছু বলার আগেই ছোটো ডোনা আর সহ্য করতে পারল না, রেগে গিয়ে বেলুমেবারের দিকে তাকিয়ে জোরে ধমক দিল। সে গরিব ঘরের মেয়ে, জানে এই টাকার কত মূল্য। আর এই দুষ্টলোকটি এমনিই টাকা কেড়ে নিল, এটা কীসের বিচার!
‘‘চুপ করো, মেয়েটি, এত বড় ঝামেলা করো না।’’
লৌহকারিগর তাড়াতাড়ি এসে ডোনার সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল, চাটুকার মুখে বেলুমেবারকে বলল, ‘‘বেলুমেবার মহাশয়, ছোটো মেয়েটা কিছু বোঝে না, দয়া করে মনোযোগ দিয়েন না। এখানে আরও বিশ হাজার বেলি আছে, সবই নিয়ে নিন, রাগ কমান, রাগ কমান।’’
বলতে বলতে সে আরও মোটা টাকার বান্ডিল বের করে বেলুমেবারের হাতে দিল।
‘‘মাত্র বিশ হাজার বেলি দিয়ে আমার রাগ কমবে?’’ বেলুমেবার ঠাট্টার হাসি হাসল, ‘‘তবে আমার রাগ কমানো সহজ, আমার পোষা প্রাণীটা রাগ না করলে আমিও মাফ করে দেব।’’
সে হাতে বাঁধা দড়ি ছেড়ে দিল, সঙ্গে সঙ্গেই এক ভয়ংকর নেকড়ে তাদের দিকে তেড়ে এল।
‘‘রোলান...’’
নামি ভয়ে ছোটো ডোনা আর লৌহকারিগরকে টেনে রোলানের পেছনে এনে দাঁড়াল। সে জানে, রোলানের শক্তি কত, ক্লিকের মতো সমুদ্রদস্যুকে সে সহজেই সামলেছে, এ তো কেবল এক পশু, কোনো চ্যালেঞ্জই নয়।