পঞ্চান্নতম অধ্যায়: বাইরে গেলে এই দুই লক্ষ তোমার
আমার হৃদয় ধক করে উঠল।
দুই বিঙের ঘুষি-লাথির জোর আমি জানি, ও যদি নিজেকে সামলে রাখতে না পারে, আর কারো ওপর জোরে হাত তোলে, তবে নিশ্চিতভাবেই বড়সড় বিপদ হবে। হয়তো কারো প্রাণই যেতে পারে।
— কী হয়েছে, তুমি কি কাউকে মেরেছ নাকি?
— দাদা, কাউকে মারিনি, দাদা তুমি হাসপাতাল চলে এসো, দাদা, জীবনে প্রথমবার এমন কিছু ঘটল।
— আচ্ছা আচ্ছা, তুমি চিন্তা কোরো না, বলো কোন হাসপাতালে আছো, আমি এখনই যাচ্ছি।
এবার দুই বিঙ তাড়াহুড়ো করে হাসপাতালের ঠিকানা জানিয়ে দিল, বলল, সে এখন জরুরি বিভাগের দরজায়ই দাঁড়িয়ে আছে।
আমি বললাম, মোবাইল চালু রেখো। তারপর ফোন রেখে, আমার সহকারীর সঙ্গে ক'টা কথা বললাম।
ইদানীং অনেকেই বক্সিং শিখছে, লিউ কাকু ভেবেছিলেন আমি একা সামলাতে পারব না, তাই বিশেষভাবে এক স্পোর্টস কলেজ পাশ যুবককে নিয়োগ করেছিলেন। তার নাম ফাং, বেশ ভালো ছেলে, কিন্তু তাত্ত্বিক জ্ঞান বেশি, হাতে-কলমে তেমন দক্ষতা নেই।
আমি ফাং-এর কাছে গিয়ে কাজ বুঝিয়ে দিলাম।
তারপর তাড়াহুড়ো করে নিচে নামলাম। ট্যাক্সি ডাকতে গিয়ে আবার একটু ভাবলাম। শেষে গেলাম কাছের এক ব্যাংকে, কার্ড থেকে দুই লক্ষ টাকা তুলে নিলাম।
এটাই আমার সব সঞ্চয়।
এ ছাড়া আমার কাছে মাত্র হাজার খানেকের মত খুচরো টাকা বাকি ছিল।
টাকা তুলে নিয়ে ট্যাক্সিতে সরাসরি হাসপাতালে চলে গেলাম।
হাসপাতালে পৌঁছে জরুরি বিভাগের দরজায় দেখি, দুই বিঙকে ঘিরে কিছু লোক চুপচাপ বসে আছে।
আমি এগিয়ে গিয়ে বললাম, ‘‘দুই বিঙ, কী হয়েছে?’’
দুই বিঙ কিছু বলার আগেই, সুঠাম চেহারার, ঘন ভ্রু-চোখের এক লম্বা লোক সামনের দিকে এগিয়ে এসে, উত্তেজিত গলায় বলল, ‘‘তুমিই কি ওর দাদা? তুমি ওর দাদা?’’
আমি শান্ত গলায় বললাম, ‘‘হ্যাঁ, আমি ওর দাদা। কী হয়েছে, ও কী করেছে?’’
‘‘ও কী করেছে? ও আমাদের একজনকে খারাপ করে দিয়েছে, জানো?’’
আমি থমকে গেলাম।
ঠিক তখন দুই বিঙ উঠে দাঁড়াল, ‘‘দাদা, না, আমি ওকে মারিনি, ব্যাপারটা হচ্ছে—’’
দুই বিঙ খুবই নার্ভাস, মাঝে মাঝে ওদের লোকেরা বাধা দিচ্ছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত বুঝতে পারলাম কী ঘটেছে।
ঘটনা এই, দুই বিঙসহ দশ-বারোজন নিরাপত্তাকর্মী ছুটির দিনে কিছু করার ছিল না বলে কাছের ফুটবল মাঠে গিয়েছিল খেলা দেখতে।
ওপারের দলের লোকেরও সংখ্যা ছিল প্রায় সমান। নিরাপত্তাকর্মীরা খেলা দেখছে দেখে ওরা প্রস্তাব দিল, এসো, তোমরা আমাদের সঙ্গে খেলে যাও।
নিরাপত্তাকর্মীরা খুব খুশি হল। কারণ তাদের খেলাধুলার সুযোগ কম, ফুটবল মাঠ সাধারণত বড়লোকদের জন্য। ওরা সুযোগ পেয়ে আনন্দিত।
তাই সবাই মিলে মজায় খেলা শুরু করল।
শুরুর দিক ভালোই চলছিল, পরে ওদিকের একজন বারবার খারাপভাবে ট্যাকল করতে লাগল।
কয়েকজন নিরাপত্তাকর্মী পড়ে গিয়েছিল, কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলার সাহস করেনি, ভাবল আর একটু খেলে চলে যাবে।
কিন্তু পরে দেখা গেল, সে ছেলেটা দুই বিঙকে টার্গেট করেছে।
তখন দুই বিঙ বল নিয়ে গোলের দিকে ছুটছে। ছেলেটা দৌড়ে এসে, ট্যাকল না করে, বরং পুরো জোরে ছোট পায়ের হাড়ে লাথি মারল দুই বিঙকে।
এখন মনে হলে, সে ছেলেটার ভাগ্যই খারাপ ছিল।
এ লাথিতে, ছেলেটার নিজেরই পায়ের হাড় ভেঙে গেল।
আর দুই বিঙ? সে যেন কিছুই টের পেল না, একবার পিছনে তাকিয়ে আবার দৌড়ে গিয়ে গোল করল!
গোল হল!
দুই বিঙ অনেকক্ষণ খুশি ছিল, কিন্তু দেখল কেউই ওর সঙ্গে আনন্দ করছে না। তাকিয়ে দেখে, মাঠে একজন ছেলেটা পা জড়িয়ে চিৎকার করছে।
ওপারের দলের লোকেরা বলল, দুই বিঙ ওকে লাথি মেরেছে।
আর ছেলেটাও এক কথায় বলল, দুই বিঙই ওকে মেরেছে!
তারপর, ওকে হাসপাতালে আনা হয়, ভর্তি, হাড় জোড়া লাগাতে হবে।
চিকিৎসার খরচ, কাজে না যাওয়ার ক্ষতিপূরণ, আরও হাজারো খরচ মিলিয়ে ওরা একেবারে দাবি করল, বিশ লক্ষ টাকা দিয়ে দাও, তাহলেই মিটে যাবে, নাহলে দুই বিঙ যেন রাজধানীতে আর থাকতে না পারে।
দুই বিঙ একদম নির্দোষ।
এ যেন ঝড়ের বেগে বিপদ এসে পড়ল।
সে খুবই উত্তেজিত হয়ে বলল, বরং তোমরা আমার একটা পা ভেঙে দাও, আমি একজন নিরাপত্তাকর্মী, এত টাকা কোথা থেকে জোগাড় করব!
ওরা বলল, তুই একটা ন্যাদে নিরাপত্তাকর্মী, তোর দশটা পায়ের দামও ওই ছেলেটার এক পায়ের সমান না!
আমি পুরো ঘটনা শুনে মোটামুটি আন্দাজ করলাম।
যারা দুই বিঙকে ঘিরে আছে, তাদের চালচলনে, কথাবার্তায় বুঝলাম, এরা মোটেও শিক্ষিত বা মর্যাদাসম্পন্ন কেউ নয়।
সম্মানী লোকেরা ফুটবল খেলায় এত নিচু কাজ করবে না। আর যদি করেও, এত নির্লজ্জভাবে বিশ লক্ষ টাকা দাবি করবে না।
এরা চাইলে পুলিশ ডাকতে পারত, বা অন্য কোনও উপায় নিতে পারত, কিন্তু এমন গ্যাং জুটিয়ে বিশ লক্ষ টাকা চাইত না।
তাছাড়া, আমি এখনো আহত ছেলেটাকে দেখিনি। বিশ লক্ষের কথা শুধু ওই বড় চোখওয়ালা ছেলের মুখে শুনলাম!
স্পষ্ট বুঝলাম, দুই বিঙকে এরা ফাঁসানোর চেষ্টা করছে।
জরুরি বিভাগের দরজায় এরা আমাদের দিকে এমনভাবে তাকাচ্ছিল, যেন এখনই আমাদের মারবে।
আমি তখন চুপচাপ বড় চোখওয়ালা ছেলেটাকে বললাম, ‘‘আহত কোথায়, আগে দেখি, ক্ষতিপূরণের কথা পরে হবে, অন্তত ভাই হিসেবে আহতটাকে তো একবার দেখবই।’’
সে চোখ পাকিয়ে বলল, ‘‘কী, ভয় দেখাতে এসেছ?’’
আমি ওর কথায় ওর টানটা চেনা চেনা ঠেকল, হেসে বললাম, ‘‘তোমার উচ্চারণ শুনে মনে হচ্ছে তুমি উত্তরাঞ্চলের, আমার বাড়িও জেলিন, উত্তরাঞ্চলেই—’’
‘‘চুপ কর! জেলিন থেকে কত লোক এসেছে, আমি কি সবাইকে পুজো করি নাকি? ধুর!’’
এ শুনে আমার সব পরিষ্কার হয়ে গেল।
এরা একদম রাস্তার লোক।
বিশ্বাস করো, উত্তরাঞ্চলে এমন লোক অনেক আছে, আর এদের জন্যই সেখানকার সুনাম মাটি হয়েছে!
আমি হাসিমুখে বললাম, ‘‘আর কিছু না, শুধু দেখতে চাই, ঠিক আছে?’’
সে ঠান্ডা হাসি দিয়ে বলল, ‘‘দেখতে চাও? খালি খাতায় দেখানো যাবে না, অন্তত ওষুধের টাকাটা তো দাও।’’
আমি নির্বিকার বললাম, ‘‘আচ্ছা, দেখে তারপর বলব।’’
এবার ওরা নিজেদের মধ্যে গুঞ্জন করে আমাকে আর দুই বিঙকে নিয়ে রোগী ওয়ার্ডে নিয়ে গেল, যেন আসামি ধরে নিয়ে যাচ্ছে।
একটি কক্ষে দেখলাম, ছোট পায়ে ভারী প্লাস্টার বাঁধা ছেলেটা শুয়ে আছে।
দেখেই বুঝলাম, কেমন ছেলে।
মাথা ছোট করে ছাঁটা, গলায়, হাতে নানা অদ্ভুত প্রাণীর ট্যাটু, কানে দুল।
ব্যবসায়ী হোক, কর্পোরেট কর্মী হোক, রাজনীতি বা সেনাবাহিনী— এমন কেউ গলায়, হাতে ট্যাটু ও কানে দুল পরে না।
এসব বাহ্যিক চিহ্ন ছাড়া, তার চেহারায় স্পষ্ট অহংকার আর হিংস্রতা।
বাহুতে পেশি, বুকের পেশিও যথেষ্ট, বোঝা যায়, জিমে সময় দেয়, নিজের মাংসপেশিতে অজানা ভালোবাসা।
সোজা কথায়, আত্মকেন্দ্রিক ও আত্মপ্রেমিক।
এদের জিমে অনেক দেখা যায়, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের পেশি দেখে, ছবি তোলে।
এদের সাধারণত প্রেমিকা থাকে না, থাকলেও বেশিদিন টেকে না। কারণ, ওর নিজের পেশিকে প্রেমিকার চেয়ে বেশি ভালোবাসে।
আমি ছেলেটাকে দেখে নিলাম।
ততক্ষণে দুই ডাক্তার এসে কিছু পরীক্ষা করছিল।
আমি এক ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘‘ক্ষত কতটা?’’
পুরুষ ডাক্তার না তাকিয়েই বলল, ‘‘পায়ের হাড়ে চিড়, গুরুতর নয়, কিছুদিন বিশ্রামে ঠিক হয়ে যাবে।’’
এতে বড় চোখওয়ালা ছেলের দল চোখ বড় বড় করে ডাক্তারকে ভয় দেখাতে চাইল।
আমি হেসে বললাম, ‘‘ডাক্তার, সব মিলিয়ে চিকিৎসার খরচ কত?’’
ডাক্তার বলল, ‘‘খুব বেশি না, প্লাস্টার বেঁধে, সাধারণ চিকিৎসা, এক্স-রে ইত্যাদি—সব মিলিয়ে দুই হাজারের ওপর হবে। বিশ্রাম জরুরি, ওকে যেন বেশি দৌড়ঝাঁপ করতে না দেওয়া হয়।’’
আমি বললাম, ‘‘ধন্যবাদ।’’
দুই ডাক্তার আমাদের দেখে ঘর ছেড়ে চলে গেল।
আমি এবার ওই ছেলেটার বিছানার কাছে গিয়ে ভালো করে দেখলাম, বয়স বিশও হবে না।
আমি বললাম, ‘‘তোমার নাম কী?’’
‘‘কেন, পুলিশি তল্লাশি?’’ বড় চোখওয়ালা আবার এগিয়ে এল।
আমি নির্বিকার বললাম, ‘‘ভাই, আমি ওর সঙ্গে কথা বলছি, আমাদের ব্যাপার পরে হবে, ঠিক আছে?’’
বড় চোখওয়ালা বলল, ‘‘তুমি কী বোঝাতে চাইছ?’’
আমি পাত্তা না দিয়ে ছেলেটাকে আবার জিজ্ঞেস করলাম, ‘‘তোমার উপাধি কী?’’
সে অন্যমনস্কভাবে তাকিয়ে চুপ রইল।
আমি আবার বললাম, ‘‘কী নামে ডাকব তোমাকে?’’
ছেলেটা এবারও পাত্তা দেয় না।
আমি ঠান্ডা হেসে দুই সেকেন্ড দাঁড়িয়ে গলা তুলে বললাম, ‘‘তোমার উপাধি কী! বলো!’’
গলা এত জোরে উঠল, ঘরের জানালাও কেঁপে উঠল।
ঘর একেবারে স্তব্ধ।
দুই-তিন সেকেন্ড পরে দরজায় একজন ডাক্তার ঢুকে বলল, ‘‘এত চিৎকার কেন, অন্য রোগীরা বিরক্ত হবে না?’’
আমি হেসে বললাম, ‘‘দুঃখিত ডাক্তার, এখনই চলে যাচ্ছি।’’
তারপর ছেলেটার দিকে ফিরলাম, ‘‘আরেকবার বলছি, তোমার উপাধি কী?’’
সে কেঁপে উঠে বলল, ‘‘আমি... আমি উ, উ বলছি।’’
আমি বললাম, ‘‘উ ভাই তাই তো! ব্যাপারটা এই— আমার ভাইয়ের সঙ্গে তোমার মাঠে খেলা করতে গিয়ে, তুমি চোট পেয়েছ। আমার ভাই বলছে, তুমি ওকে ট্যাকল করেছ, তোমরা বলছো, ও তোমাকে।’’
‘‘আমি কে কাকে প্রথমে লাথি মারল তা বিচার করব না। চূড়ান্ত ফল হল, তুমি চোট পেয়েছো, তাই তো?’’
এ কথা বলে, আমি ব্যাগ থেকে দশ হাজার টাকা বের করে, ওজন করে, ওর পাশে চাপা দিয়ে বললাম, ‘‘এটা দশ হাজার টাকা, নাও, ওষুধের খরচে দাও, বিশ্রাম করো। আমি শুধু এটাই দিতে পারব। তোমার জন্য যথেষ্ট বলেই মনে করি।’’
টাকা বের করামাত্র, হঠাৎ বড় চোখওয়ালা ছেলেটা ছুটে এসে টাকা নিতে চাইছিল।
আমি চেপে ধরলাম।
‘‘তুমি কী করছো? এই টাকা আমি এই ছেলেটার জন্য এনেছি! তোমার কী অধিকার?’’
সে হতবাক, ‘‘তুমি কী বলছো, কী বলছো?’’
আমি পাত্তা না দিয়ে, দশ হাজার টাকা উ-র হাতে দিয়ে বললাম, ‘‘রসিদ লাগবে না, তোমার হাতে দিলাম, আমার ভাইয়ের হয়ে তোমার ক্ষতি মিটিয়ে দিলাম।’’
‘‘বিশ লক্ষ! বিশ লক্ষ!’ বড় চোখওয়ালা চিৎকার করল।
আমি হেসে, ওর দিকে ফিরে স্পষ্ট করে বললাম, ‘‘তুমি না বিশ লক্ষ চেয়েছিলে? ঠিক আছে, একটু পর বাইরে চলো, তোমাকে বিশ লক্ষই দেব!’’
আমি ওর চোখে তাকিয়ে, ধাপে ধাপে বললাম...